ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার সম্পর্কের রূপান্তর: একটি ভূ-রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ইতিহাসে ইরান, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ত্রিমুখী সম্পর্কটি কেবল একটি অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের এক জটিল সমীকরণকে উপস্থাপন করে। এই সম্পর্কের পরিক্রমাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি গত সাত দশকে চরম মিত্রতা থেকে শুরু করে ছায়া যুদ্ধ এবং অবশেষে ২০২৫ সালের প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন ইরান এবং ইসরায়েল ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের প্রধান দুই স্তম্ভ, তখন থেকে শুরু করে বর্তমানের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বনাম ‘আব্রাহাম জোট’ এর সংঘাত পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রতিবেদনটি ১৯৫৩ সালের সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের প্রারম্ভে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্কের একটি সর্বাঙ্গীণ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছে।
ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং ১৯৫৩ সালের বাঁকবদল
ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সূচনালগ্ন ছিল পারস্পরিক আস্থা এবং কৌশলগত সহযোগিতার। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানিরা ব্রিটিশ এবং রুশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি সম্ভাব্য রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করত। ১৯০৫ সালের সাংবিধানিক বিপ্লবে একজন মার্কিন শিক্ষকের আত্মত্যাগ এই বন্ধুত্বের ঐতিহাসিক গভীরতা প্রমাণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যখন ব্রিটেন এবং রাশিয়া ইরান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে গড়িমসি করছিল, তখন মার্কিন চাপের কারণেই ১৯৪৬ সালে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান: অবিশ্বাসের সূচনা
১৯৫৩ সালটি এই সম্পর্কের ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ইরানের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক যখন অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানিকে জাতীয়করণের উদ্যোগ নেন, তখন ব্রিটিশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (CIA ও MI6) একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে পুনরায় ক্ষমতায় বসানো হয়। যদিও এই পদক্ষেপটি তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কমিউনিজম ঠেকানোর জন্য নেওয়া হয়েছিল, তবে এটি ইরানের সাধারণ মানুষের মনে মার্কিনবিরোধী জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে।
| কালক্রম | ঘটনা | কৌশলগত গুরুত্ব |
| ১৯৫৩ | সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থান |
শাহের ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মার্কিন নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি। |
| ১৯৫৪ | তেল কনসোর্টিয়াম চুক্তি |
ইরানের তেলের ওপর মার্কিন ও ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। |
| ১৯৫৭ | ‘অ্যাটমস ফর পিস’ কর্মসূচি |
মার্কিন সহায়তায় ইরানের পারমাণবিক গবেষণার সূচনা। |
| ১৯৭২ | প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সফর |
ইরানকে মার্কিন নিরাপত্তার ‘স্তম্ভ’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান। |
ইসরায়েল-ইরান মিত্রতা: প্রান্তীয় নীতি বা পেরিফেরি ডকট্রিন
ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল কৌশলগত বাস্তববাদের ভিত্তিতে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তুরস্কের পর দ্বিতীয় মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে ইরান তাকে স্বীকৃতি দেয়। ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের ‘প্রান্তীয় নীতি’ (Periphery Doctrine) ছিল এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। এই নীতির লক্ষ্য ছিল আরব বিশ্বের শত্রুতা মোকাবিলায় অ-আরব এবং অ-সুন্নি শক্তিগুলোর (যেমন ইরান, তুরস্ক, ইথিওপিয়া এবং কুর্দিরা) সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক জোট গঠন করা。
শাহের আমলে সহযোগিতা এবং জ্বালানি রাজনীতি
১৯৬০ এবং ৭০-এর দশকে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গভীর সহযোগিতা ছিল। ইসরায়েল তার জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ ইরান থেকে পেত এবং ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর তারা যৌথভাবে ইলাত-আশকেলন পাইপলাইন নির্মাণ করে ইরানের তেল ইউরোপীয় বাজারে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক (SAVAK) গঠনে এবং ইরানি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণে ইসরায়েলি মোসাদ এবং সামরিক উপদেষ্টারা সরাসরি ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন সময়ে ইরান এবং ইসরায়েল উভয়েই নাসেরবাদী মিশর এবং বাথিস্ট ইরাককে তাদের অভিন্ন শত্রু হিসেবে বিবেচনা করত。
১৯৭৯ সালের বিপ্লব এবং ত্রিমুখী সম্পর্কের পতন
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে বদলে দেয়। আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বড় শয়তান’ (Great Satan) এবং ইসরায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ (Little Satan) হিসেবে আখ্যায়িত করে। ৪ নভেম্বর ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং ৫২ জন মার্কিন কর্মীকে ৪৪৪ দিন জিম্মি করার ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটায়।
আদর্শিক রূপান্তর এবং প্রতিরোধের অক্ষ
বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে চলে আসে ফিলিস্তিন ইস্যু এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় বৈধতা অস্বীকার করা 1। ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (Axis of Resistance) নামে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, যার মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস এবং ইসলামিক জিহাদ অন্তর্ভুক্ত হয়। ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার এই শত্রুতা ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর আরও তীব্র হয় এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘ছায়া যুদ্ধ’ (Shadow War) শুরু হয় 1।
পারমাণবিক উত্তেজনা এবং ডি-লিংকড কূটনীতি
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বৈশ্বিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। মজার বিষয় হলো, ১৯৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ইরানের পারমাণবিক গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তবে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে পশ্চিমারা সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলেও ইরান গোপনে তার সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যায়, যা ২০০২ সালে বিশ্ববাসীর কাছে ধরা পড়ে।
JCPOA এবং সর্বোচ্চ চাপের নীতি
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ২০১৫ সালে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন’ (JCPOA) স্বাক্ষরিত হয়, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমাবদ্ধ করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে ইরান পুনরায় তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বৃদ্ধি করে এবং ২০২৫ সালের শুরুতে তারা পারমাণবিক অস্ত্রের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।
২০২৪-২০২৫: ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকম্প এবং আসাদ সরকারের পতন
২০২৪ এবং ২০২৫ সাল মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণকে আমূল বদলে দিয়েছে। ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো একযোগে ইসরায়েল এবং মার্কিন স্বার্থে হামলা চালাতে শুরু করে। তবে ২০২৪ সালের শেষভাগে ইরানের আঞ্চলিক অবস্থানের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে সিরিয়া থেকে।
সিরিয়ার পতন: প্রতিরোধের অক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া
৮ ডিসেম্বর ২০২৪-এ ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের পর বাশার আল-আসাদের সরকারের পতন ঘটে। আসাদ ছিলেন ইরানের প্রধান কৌশলগত মিত্র, যার মাধ্যমে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করত। বিদ্রোহী জোট হায়াত তাহরির আল-শাম (HTS) এর হাতে দামেস্কের পতন ইরানের জন্য একটি ঐতিহাসিক কৌশলগত পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
| প্রভাবের ক্ষেত্র | আসাদ পরবর্তী সিরিয়া এবং ইরানের পরিস্থিতি |
| কৌশলগত গভীরতা |
ইরান তার ‘স্থল সেতু’ (Land Bridge) হারিয়েছে, যা তেহরান থেকে বৈরুত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। |
| আর্থিক লোকসান |
সিরিয়ায় গত এক দশকে ইরানের বিনিয়োগ করা প্রায় ৩০-৫০ বিলিয়ন ডলার কার্যত নিষ্ফল হয়েছে। |
| হিজবুল্লাহর অবস্থা |
সিরিয়ার করিডোর বন্ধ হওয়ায় লেবাননের হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং দুর্বল হয়ে পড়েছে। |
| নতুন নেতৃত্ব |
সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ইরানের হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছেন। |
সিরিয়ার এই পরিবর্তন ইরানকে তার নিজ সীমান্তের মধ্যে গুটিয়ে যেতে বাধ্য করেছে এবং ইসরায়েলের জন্য তার উত্তর সীমান্তের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধ: প্রলয়ংকরী প্রত্যক্ষ সংঘাত
সিরিয়ার পতনের পর ইরান যখন কোণঠাসা, ঠিক তখনই ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়াবহ প্রত্যক্ষ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই সংঘাতটি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
১৩ জুন ২০২৫: ইসরায়েলের আগাম হামলা
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন রিপোর্ট দেয় যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির খুব কাছাকাছি, তখন ১৩ জুন ২০২৫-এ ইসরায়েল ‘প্রি-এম্পটিভ’ বা আগাম হামলা শুরু করে। প্রায় ২০০টি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ড সেন্টারে ৩৩০টি বোমা বর্ষণ করে। এই হামলায় ইরানের অন্তত ১৪ জন পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হন。
ইরানের পাল্টা জবাব: অপারেশন ট্রু প্রমিস ৩
ইরান এর জবাবে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৩’ শুরু করে এবং প্রায় ২৮০-৩০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইসরায়েলের জেরুজালেম, তেল আবিব এবং হাইফা লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করে। যদিও ইসরায়েলি ও মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এর ৯০ শতাংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়, তবে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র হাইফার তেল শোধনাগারে আঘাত হানে।
মার্কিন হস্তক্ষেপ এবং যুদ্ধবিরতি
২১-২২ জুন ২০২৫-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে মার্কিন বিমান বাহিনী ইরানের ফোরডো, নাতানজ এবং ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় চূড়ান্ত আঘাত হানে। ইরান এর প্রতিক্রিয়ায় কাতারের আল উদেদ মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালালে পরিস্থিতি চরম উত্তেজনার দিকে যায়। তবে ২৩ জুন ২০২৫-এ একটি আকস্মিক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়。
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট: ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং প্রতিবাদ
২০২৫ সালের যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় পরাজয়ের পর ইরান ২০২৬ সালের শুরুতে এক গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের সম্মুখীন হয়। যুদ্ধের খরচ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ধসে পড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ
২০২৫ সালের শেষের দিকে ইরানের ৩১টি প্রদেশেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই বিক্ষোভগুলো ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের চেয়েও ব্যাপক আকার ধারণ করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম দিকে বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর ব্যবস্থার ফলে অন্তত ১১৬ জন নিহত হয় এবং ২,০০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল এই বিক্ষোভগুলোতে সরাসরি ইন্ধন দিচ্ছে。
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আইআরজিসি (IRGC)-এর দ্বন্দ্ব
২০২৪ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একজন মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিতি পেলেও ২০২৫ সালের যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ চাপে তার ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। একদিকে তিনি পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে আইআরজিসি এবং কট্টরপন্থী সংসদ তার প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা দিচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পেজেশকিয়ান স্বীকার করেন যে ইসরায়েল ২০২৫ সালের যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে ইরানের চেয়ে এগিয়ে ছিল, যা কট্টরপন্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে。
আব্রাহাম জোট এবং আঞ্চলিক নতুন বিন্যাস
ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ২০২৫-২০২৬ সময়কালটি ছিল কৌশলগত সফলতার বছর। ২০২০ সালে শুরু হওয়া ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটে রূপান্তরিত হচ্ছে।
সৌদি-ইসরায়েল স্বাভাবিকীকরণের পথে ২০২৬
২০২৬ সালটি সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার দশম বছর 27। মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরব এবং ইসরায়েলের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির জন্য কাজ করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাবকে চূড়ান্তভাবে প্রতিহত করবে। তবে সৌদি আরব এখনও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের শর্তে অটল রয়েছে।
| জোটের সম্প্রসারণ | ২০২৫-২০২৬ এর অগ্রগতি | লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য |
| আব্রাহাম অ্যাকর্ডস |
কাজাখস্তান ও সোমালিল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তি। |
ইরানের বিরুদ্ধে একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্য বলয় তৈরি। |
| সিরিয়া ও লেবানন |
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই দেশগুলোকে জোটে টানার প্রস্তাব দিয়েছে। |
হিজবুল্লাহ ও ইরানি প্রভাবের চিরস্থায়ী অবসান। |
| আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা |
ইসরায়েল, জর্ডান, সৌদি আরব ও আমিরাতের সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা। |
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিরোধ। |
ভবিষ্যতের গতিপথ: ২০২৬ এবং পরবর্তী সময়কাল
ইরান, ইসরায়েল এবং মার্কিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে: ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার শেষ পরিণতি, দেশটির অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং প্রতিরোধের অক্ষের পুনর্গঠন।
১. পারমাণবিক অচলাবস্থা এবং ‘প্রি-এম্পশন’ নীতি
২০২৫ সালের জুনের হামলার পর ইরান তাদের ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তবে তেহরানের নতুন সামরিক ডকট্রিন অনুযায়ী তারা এখন ‘আগাম হামলা’ (Pre-emptive Strike) করার অধিকার সংরক্ষণ করে বলে ঘোষণা দিয়েছে। যদি ইরান পুনরায় তাদের সমৃদ্ধকরণ শুরু করে, তবে ২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল আরও বড় ধরনের বিমান হামলা চালাতে পারে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন。
২. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিপ্লব বনাম শাসন টিকিয়ে রাখা
২০২৬ সালের বিক্ষোভগুলো নির্দেশ করে যে ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে 6। যদি পেজেশকিয়ান প্রশাসন অর্থনৈতিক সংস্কার এবং পশ্চিমা সমঝোতায় ব্যর্থ হয়, তবে আইআরজিসি (IRGC) সরাসরি ক্ষমতা দখল করতে পারে অথবা দেশটিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে।
৩. মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা স্থাপত্য
সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন এবং হিজবুল্লাহর দুর্বলতা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ‘কৌশলগত গভীরতা’ (Strategic Depth) কেড়ে নিয়েছে 16। ২০২৬ সালে ইসরায়েল সম্ভবত একটি আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে, যার সঙ্গে সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব দেশগুলোর একটি সুসংহত সামরিক জোট থাকবে। এই পরিস্থিতিতে ইরান সম্ভবত উত্তর আফ্রিকা (যেমন তিউনিসিয়া) অথবা মধ্য এশিয়ার দিকে তার প্রভাব বিস্তারের নতুন ক্ষেত্র খুঁজবে。
উপসংহার
ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার সম্পর্কের ইতিহাস একটি পূর্ণ বৃত্ত অতিক্রম করেছে। ১৯৫৩ সালের মিত্রতা থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের মহাপ্রলয়ংকরী যুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ই ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। ২০২৬ সালের শুরুতে আমরা এমন এক মধ্যপ্রাচ্য দেখছি যেখানে পুরনো শত্রুতাগুলো এখনও বিদ্যমান, কিন্তু যুদ্ধের ধরণ এবং শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে। ইরানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তার ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং বিক্ষুব্ধ জনগণকে সামাল দেওয়া, যখন ইসরায়েল ও আমেরিকা একটি ‘ইরান-মুক্ত’ নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এই ত্রিমুখী সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শান্তি নয়, বরং সম্ভবত একটি দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র স্থবিরতা বা ‘আর্মড স্টেলমেট’ এর দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি পক্ষই একে অপরের ভুলের অপেক্ষায় থাকবে।